নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করেছে সরকার। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন উইংয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনগ্রেড ও নিয়োগযোগ্যতা নির্ধারণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ প্রক্রিয়ায় ৯১টি ক্যাটাগরির ৪ হাজার ৬৯৯টি পদের বেতনগ্রেড ও নিয়োগযোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি ক্যাটাগরির পদের বেতনগ্রেড ও নিয়োগযোগ্যতা সংশোধন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পদের বেতন স্কেল, পদের সংখ্যা এবং নিয়োগ ও পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট শর্তও নির্ধারণ করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) কৃষি সচিব বরাবর অর্থ বিভাগের উপসচিব মো. সোহেল মারুফ স্বাক্ষরিত এক পত্রে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়।
তবে নতুন এই আদেশ জারির পরপরই বিএডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, মহাব্যবস্থাপকসহ প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সব পদের বেতনগ্রেড কমপক্ষে এক ধাপ নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ‘ফিডার পদে’ চাকরির মেয়াদ অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা জাতীয় বেতন স্কেলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে দেশব্যাপী অর্ধদিবস কর্মবিরতি এবং রাজধানীর দিলকুশায় কৃষি ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের আদেশে বলা হয়েছে, বিএডিসির শীর্ষ পদ ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে সরকারের গ্রেড-১ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে প্রেষণে স্ববেতনে নিয়োগ দেওয়া হবে। এছাড়া চারটি ‘পরিচালক’ পদে সরকারের যুগ্মসচিব অথবা অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হবে।
তবে ‘সচিব’ (১টি পদ) পদের ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্র অনুযায়ী পদ ও নাম পরিবর্তনপূর্বক কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত খসড়া নিয়োগবিধি প্রেরণের পর বেতনগ্রেড নির্ধারণ করা হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদেশ কার্যকরের জন্য বেশ কয়েকটি শর্তও আরোপ করা হয়েছে। বিএডিসিকে নতুন নিয়োগযোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্তাবলী অনুযায়ী তাদের প্রবিধানমালা বা নিয়োগবিধি প্রণয়ন ও সংশোধন করতে হবে। তবে এসব বিধিমালা চূড়ান্ত করার আগে অর্থ বিভাগের বাধ্যতামূলক মতামত ও সম্মতি গ্রহণ এবং প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির অনুমোদন নিতে হবে।
এছাড়া যেসব পদ আউটসোর্সিং পদ হিসেবে সৃষ্টি বা বিলুপ্ত হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের ‘আউটসোর্সিং সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৩’ অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি জারিকৃত পূর্ববর্তী আদেশ বাতিল ঘোষণা করেছে অর্থ বিভাগ।
বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, এতদিন মহাব্যবস্থাপক এবং প্রধান প্রকৌশলী পদ ছিল দ্বিতীয় গ্রেডভুক্ত। নতুন আদেশে এ দুটি পদকে তৃতীয় গ্রেডে নামিয়ে আনা হয়েছে।
একইভাবে তৃতীয় গ্রেডের অতিরিক্ত পরিচালক ও অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক পদগুলোকে চতুর্থ গ্রেডে, চতুর্থ গ্রেডের উপপ্রধান প্রকৌশলী, যুগ্মপ্রধান ও যুগ্ম হিসাব নিয়ন্ত্রক পদগুলোকে পঞ্চম গ্রেডে এবং পঞ্চম গ্রেডের উপপরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী পদগুলোকে ষষ্ঠ গ্রেডে নির্ধারণ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, একইভাবে প্রতিষ্ঠানের প্রায় সব পদই এক ধাপ করে অবনমিত করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের আদেশ অনুযায়ী, বিএডিসির চারটি পরিচালক পদে সরকারের যুগ্মসচিব বা অতিরিক্ত সচিবদের মধ্য থেকে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বিএডিসির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কর্মকর্তাদের সদস্য পরিচালক কিংবা উচ্চতর পদে যাওয়ার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। তারা জানান, অতীতে বিএডিসির বহু কর্মকর্তা সফলতার সঙ্গে সদস্য পরিচালক এমনকি চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া এ ধরনের সংস্থায় সদস্য পরিচালক পদে নিয়োগের যোগ্যতা নির্ধারণ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক সার্কুলারও বিদ্যমান রয়েছে।
নতুন প্রজ্ঞাপনে দ্বিতীয় গ্রেড প্রাপ্তির সুযোগ রাখা হলেও তার জন্য তৃতীয় গ্রেডে পাঁচ বছর চাকরিসহ মোট ২৪ বছরের চাকরির শর্ত আরোপ করা হয়েছে। একইভাবে পঞ্চম গ্রেডে পদোন্নতির জন্য ১৩ বছরের চাকরির শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের দাবি, জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী সাধারণত দ্বিতীয় গ্রেড প্রাপ্তির জন্য ১৭ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হয়। কিন্তু নতুন আদেশে তৃতীয় গ্রেড থেকে তদূর্ধ্ব স্কেল প্রাপ্তির জন্য ২৪ বছরের দীর্ঘমেয়াদি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। একইভাবে পঞ্চম গ্রেডে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রচলিত ১০ বছরের পরিবর্তে ১৩ বছরের শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যা তারা অযৌক্তিক বলে মনে করছেন।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে বিএডিসির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ‘নির্বাহী প্রকৌশলী’ পদটি পঞ্চম গ্রেডভুক্ত ছিল। কিন্তু নতুন আদেশে পদটিকে এক ধাপ কমিয়ে ষষ্ঠ গ্রেডে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া শুরু থেকেই বিএডিসির ‘প্রধান চিকিৎসক’ পদটি চতুর্থ গ্রেডভুক্ত থাকলেও নতুন প্রজ্ঞাপনে তা সরাসরি ষষ্ঠ গ্রেডে নামিয়ে আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এটি ক্যাডার সার্ভিসের সমমর্যাদার পদের সঙ্গে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে আদেশ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন বিএডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
বিএডিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে দেশব্যাপী সব কার্যালয়ে অর্ধদিবস কর্মবিরতি পালন করা হবে। একই দিন বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাজধানীর দিলকুশায় বিএডিসির প্রধান কার্যালয় ‘কৃষি ভবন’-এর সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে।
তাদের দাবি, আদেশ বাতিল না হলে আগামী সপ্তাহ থেকে দেশব্যাপী বিএডিসির সব কার্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’-এর মতো কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।