সারাদেশ

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি বাংলাদেশের খলিলুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট: ০১:১৯, ০৪ জুন ২০২৬
photo

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে ঐতিহাসিক জয় লাভ করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। মর্যাদাপূর্ণ এই পদের নির্বাচনে তিনি সাইপ্রাসের বহুপক্ষীয়তাবিষয়ক বিশেষ দূত আন্দ্রেজ কাকাউরিসকে পরাজিত করে আগামী এক বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। এই গৌরবময় অর্জনের মাধ্যমে দীর্ঘ ৪০ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বসতে যাচ্ছে কোনো বাংলাদেশি প্রতিনিধি।

 

মঙ্গলবার (২ জুন) নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদকক্ষে আনুষ্ঠানিক ভোটগ্রহণ শেষে এই চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মোট ১৯০টি ভোট পড়ে। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রার্থী খলিলুর রহমান ৯৯টি দেশের সমর্থন পেয়ে বিজয়ী হন। অন্যদিকে, তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের আন্দ্রেজ কাকাউরিস পান ৯১টি ভোট। অর্থাৎ, ৮ ভোটের ব্যবধানে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে হারিয়ে জয় ছিনিয়ে নেয় বাংলাদেশ।

 

সাধারণ পরিষদের বিদায়ী ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি এবং জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন সভাপতির নাম ঘোষণা করেন। ফলাফল ঘোষণার সময় সেখানে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উপস্থিত ছিলেন।

 

ভোটের ফলাফল যখন ঘোষণা করা হচ্ছিল, তখন সাধারণ পরিষদকক্ষেই উপস্থিত ছিলেন খলিলুর রহমান। বিজয়ী হিসেবে নিজের নাম শোনার পর তিনি দুই হাত তুলে মোনাজাত করেন। পরবর্তীতে নতুন সভাপতি হিসেবে তিনি সাধারণ পরিষদকক্ষে দাঁড়িয়ে নিজের বক্তব্যও প্রদান করেন।

 

জাতিসংঘের ইতিহাসে এর আগে ১৯৮৬ সালে সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার দীর্ঘ চার দশক পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মাধ্যমে আবারও সেই গৌরব ফিরে পেল বাংলাদেশ।

 

উল্লেখ্য, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। এরপর ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বনেতাদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক।

 

জাতিসংঘের আঞ্চলিক পালাক্রম বা রোটেশন পদ্ধতি অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদটি এবার ‘এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গ্রুপ’-এর জন্য নির্ধারিত ছিল। এই একই গ্রুপ থেকে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, যদিও সাইপ্রাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি সদস্য রাষ্ট্র।

 

এই পদের জন্য বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আরও আগে। ২০২০ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন নির্বাচনে লড়াইয়ের আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ২০২৬ সালের জন্য এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে বাংলাদেশের প্রার্থীতার বিষয়টি জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।

 

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে এই পদের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। তবে সে সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস ছাড়াও ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি থাকায় ঢাকা কৌশলগত কারণে কিছুটা ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছিল।

 

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নতুন সরকার গঠন করে। এরপর টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় খলিলুর রহমানকে, যিনি এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন।

 

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পূর্বের প্রার্থী পরিবর্তন করে খলিলুর রহমানকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয় এবং তৌহিদ হোসেনের নাম বাদ পড়ে। এরই মধ্যে ফিলিস্তিনও নির্বাচন থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নিলে লড়াইটি দ্বিমুখী রূপ নেয়। অবশেষে মঙ্গলবারের নির্বাচনে সাইপ্রাসকে হারিয়ে চূড়ান্ত বিজয় লাভ করল বাংলাদেশ।