নিজস্ব প্রতিবেদক
ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত অন্তত ১২টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ইরানের পাল্টা হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওয়াশিংটনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘাঁটিগুলো এখন উপকারের চেয়ে মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ওয়াশিংটনে আয়োজিত এক বিশেষ সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক একদল বিশেষজ্ঞ এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ‘প্রজেক্ট অন মিডল ইস্ট পলিটিক্যাল সায়েন্স’-এর পরিচালক মার্ক লিঞ্চ জানান, গত এক মাসের ব্যবধানে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের ভৌত কাঠামোকে কার্যত অকেজো করে দিয়েছে। এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনেও এই ঘাঁটিগুলোকে ‘বসবাসের অনুপযোগী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির এই বিশালত্বের বিষয়টি জনসমক্ষে স্বীকার করেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরটি বর্তমানে চরম অস্তিত্ব সংকটে। প্রায় ৯ হাজার সামরিক কর্মকর্তার আবাসস্থল এই নৌঘাঁটিটি ইরানের হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় সেখান থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মার্ক লিঞ্চের দাবি, বাহরাইনে পুনরায় পঞ্চম নৌবহরের কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা এখন প্রায় অসম্ভব এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চিরাচরিত প্রভাব পুনরুদ্ধারের কোনো বিকল্প পথ আপাতত নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ১৯টি সামরিক সাইট রয়েছে, যেখানে প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য মোতায়েন ছিল। ১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর ‘তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা’র যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা বড় সংকটের মুখে।
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ শানা আর মার্শাল জানান, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি থাকা বা ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কের প্রচার চালানো এখন আরব দেশগুলোর জন্য লাভের চেয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের হামলার কারণে এই অঞ্চলের দেশগুলোর জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি বিমানবন্দর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি প্রমাণ করে যে আমেরিকার ‘নিরাপত্তা ছাতা’ তার মিত্রদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ। অতীতে খোবার টাওয়ারে হামলা বা ওসামা বিন লাদেনের ক্ষোভের মূলে এই ঘাঁটিগুলোর উপস্থিতি থাকলেও, এখন সেগুলো নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে পারছে না।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্র্যাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পার্সি বলেন, চলতি সপ্তাহে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ইরানের হামলা বন্ধের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। এতে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের বঞ্চিত ও আশাহত মনে করছে।
পার্সি আরও ব্যাখ্যা করেন, এই ঘাঁটিগুলো ইরানের আক্রমণ ঠেকাতে তো পারেইনি, বরং এগুলোই এখন হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু। ফলে নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা ভেঙে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশগুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় হয় ইরানের সাথে সমঝোতা, না হয় ইসরায়েলের সাথে নতুন কোনো আঞ্চলিক জোটের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।