সারাদেশ

ইরানের পক্ষে হুতিদের সরাসরি অংশগ্রহণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট: ১১:৪৩, ৩০ মার্চ ২০২৬
photo

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এক নতুন ও জটিল মোড় নিয়েছে। ইরানের সমর্থনে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ শুধু ইসরায়েলের জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। লোহিত সাগর ও কৌশলগত জলপথগুলোতে হুতিদের ক্রমবর্ধমান হামলা বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে হুতিরা। শুরুতে এসব হামলা খুব একটা কার্যকর না হলেও ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তেল আবিবের একটি আবাসিক ভবনে ড্রোন আঘাত হানলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

 

তবে সামরিক হুমকির চেয়েও বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ লোহিত সাগরকে কেন্দ্র করে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত হুতিরা লোহিত সাগরে প্রায় ২০০টি হামলা চালিয়েছে। এতে ৩০টির বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একটি জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই রুট দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় অর্ধেক কমে গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় এবং হুতিরা লোহিত সাগরের রুট অবরুদ্ধ করে রাখে, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ ধাক্কার সম্মুখীন হবে। কারণ, এই দুটি পথ দিয়েই বিশ্বের সিংহভাগ জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন করা হয়। তবে আশার কথা হলো, থাইল্যান্ডের তেলবাহী জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচলের বিষয়ে সম্প্রতি ইরানের সাথে একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।

 

উত্তেজনা প্রশমনে এরই মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের উদ্যোগে ইসলামাবাদে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও আলোচনার মাধ্যমে ‘আস্থা তৈরি’র ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

 

সংঘাত এখন আর নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হয়েছে। ইসরায়েলি সেনারা লেবাননের ভূখণ্ডের প্রায় ৭ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। অন্যদিকে, কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় রাডার ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

 

শনিবার ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরানে ইসরায়েলি বাহিনী 'সরকারের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে' বিমান হামলা চালিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা অন্তত ১০টি বিকট বিস্ফোরণ ও আকাশে কালো ধোঁয়া দেখার কথা জানিয়েছেন। এদিকে, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২ মার্কিন সেনা আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

 

যুদ্ধে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ধারণা, রাশিয়া থেকে উন্নত 'শাহেদ ড্রোন' মানবিক সহায়তার আড়ালে আজারবাইজান হয়ে ইরানে পৌঁছাচ্ছে। যদিও ক্রেমলিন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, স্থলবাহিনী ছাড়াই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা ইরানে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।

 

উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই বহুমুখী সংঘাত এখন এক বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে। হুতিদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বদলে দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।