নিজস্ব প্রতিবেদক
ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তারা এখন গভীর সংকটের মুখে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা এবং তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। একদিকে ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয়, অন্যদিকে সীমিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা—এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট হচ্ছে দেশগুলোর বাজেট।
পাকিস্তানে প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আমদানি করা এই দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা, চারদিনের কর্মসপ্তাহ চালু এবং সরকারি কর্মকর্তাদের জ্বালানি ভাতা কমানোর মতো কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে শাহবাজ শরিফ সরকার। বাংলাদেশ ৯৫ শতাংশ তেল আমদানিনির্ভর হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় টান পড়েছে। কিছু এলাকায় পেট্রোল পাম্পে সাময়িক সংকট দেখা দিলেও রেশনিং পদ্ধতির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় থাকা শ্রীলঙ্কা নতুন করে সংকটে পড়েছে। জ্বালানি বাঁচাতে প্রতি বুধবার সরকারি ছুটি এবং যানবাহনের জন্য বাধ্যতামূলক 'ফুয়েল পাশ' পদ্ধতি পুনরায় চালু করা হয়েছে।
সংঘাতের আঁচ লেগেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ মিসর এবং পূর্ব আফ্রিকার ইথিওপিয়াতেও। মিসর সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে দোকান ও শপিংমল দ্রুত বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি দেশটিতে জ্বালানির দাম ১৫ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মান কমতে থাকায় আমদানি ব্যয় আরও বাড়বে। বিশেষ করে পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যপণ্যের বাজারে। উদাহরণস্বরূপ, পাকিস্তানে ডিজেলের দাম বাড়লে গম ও আটার দাম বাড়া অনিবার্য, কারণ উৎপাদন ও পরিবহণ উভয় ক্ষেত্রেই ডিজেল অপরিহার্য।
সব মিলিয়ে ভূ-রাজনৈতিক এই সংঘাত কেবল যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই, বরং দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ মানুষের পাতিল ও পকেটে টান দিচ্ছে, যা বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সংকেত দিচ্ছে।