সারাদেশ

বিনিয়োগে দ্বিতীয় পাসপোর্ট: সহজে নাগরিকত্ব দিচ্ছে যে দেশগুলো

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে বিকল্প নাগরিকত্বের চাহিদা; বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে ক্যারিবীয়, ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট: ০৪:২২, ০৯ মার্চ ২০২৬
photo

বিদেশে বসবাস কিংবা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে দ্বিতীয় নাগরিকত্বের প্রতি আগ্রহ বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে। সহজ শর্তে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়—এমন দেশের খোঁজ অনেকেই করছেন। এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক মার্কিন নাগরিক দ্বিতীয় পাসপোর্ট নিতে চান অথবা ইতিমধ্যে নিয়েছেন। আবার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ বিদেশে বসবাসের কথা ভেবেছেন বা পরিকল্পনা করছেন।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রায় ৪৪ লাখ মার্কিন নাগরিক বিদেশে বসবাস করেছেন, যা ২০১০ সালের তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকের কাছে দ্বিতীয় নাগরিকত্বের মূল আকর্ষণ বিদেশে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়া নয়; বরং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে বিকল্প সুযোগ তৈরি করে রাখা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব (Citizenship by Investment–CBI) কর্মসূচি বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ বা অনুদানের বিনিময়ে আবেদনকারীরা নাগরিকত্ব এবং শেষ পর্যন্ত পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ পান। তবে গত এক দশকে নানা কেলেঙ্কারি ও কূটনৈতিক চাপের কারণে অনেক দেশ এ ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম ও কড়াকড়ি আরোপ করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সাময়িকী International Living ২০২৬ সালে তুলনামূলক দ্রুত ও সহজে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়—এমন কয়েকটি দেশের তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের কয়েকটি দেশ যেমন রয়েছে, তেমনি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশও রয়েছে। তথ্যসূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে Forbes–এর প্রতিবেদন।

কম্বোডিয়া
কম্বোডিয়া - অসমীয়া ৱিকিপিডিয়া

কম্বোডিয়া–এ অনুদান বা অনুমোদিত বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার ডলার বা তার বেশি বিনিয়োগ করে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। বিনিয়োগকারীরা আবাসন, ব্যবসায়িক প্রকল্প বা সরকারি তহবিলে বিনিয়োগ করতে পারেন। এখানে বসবাসের বাধ্যবাধকতা নেই, ফলে এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনামূলক সহজ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত।

জর্ডান
জর্ডান - উইকিউক্তি

জর্ডান–এর নাগরিকত্ব কর্মসূচি মূলত অতি উচ্চ সম্পদশালী বিনিয়োগকারীদের লক্ষ্য করে তৈরি। নাগরিকত্ব পেতে প্রায় ১৪ লাখ ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। সাধারণত বড় অর্থনৈতিক প্রকল্প, আবাসন খাত বা ব্যাংকে আমানতের মাধ্যমে এই বিনিয়োগ করা যায়।

মিসর
Flag of Egypt - Wikipedia

মিসর–এ তুলনামূলক কম খরচে নাগরিকত্বের সুযোগ রয়েছে। এখানে ন্যূনতম ১ লাখ ডলার অনুদান বা ৫ লাখ ডলার ব্যাংকে তিন বছর মেয়াদে জমা রেখে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যায়। কর্মসূচিটি নতুন হলেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

তুরস্ক
তুরস্কের পতাকা - সহজ ইংরেজি উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ

ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত তুরস্ক–এ নাগরিকত্ব পেতে চার লাখ ডলারের আবাসন কিনতে হয় অথবা পাঁচ লাখ ডলার ব্যাংকে জমা বা বিনিয়োগ করতে হয়। সাধারণত এই বিনিয়োগ অন্তত তিন বছর ধরে রাখতে হয়। তবে তুরস্কের নাগরিকত্ব পেলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বসবাসের অধিকার পাওয়া যায় না।

নর্থ মেসেডোনিয়া
ছবি:Flag of North Macedonia.svg - উইকিপিডিয়া

নর্থ মেসেডোনিয়া–তে অনুমোদিত বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। বিনিয়োগের প্রাথমিক পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ইউরো এবং এই বিনিয়োগ অন্তত তিন বছর ধরে রাখতে হয়। দেশটি ইউরোপে অবস্থিত হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়।

সেন্ট লুসিয়া
সেন্ট লুসিয়া - উইকিপিডিয়া

ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশ সেন্ট লুসিয়া–এ ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার অনুদান বা অনুমোদিত আবাসন খাতে প্রায় ৩ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে দেশটিতে বসবাসের বাধ্যবাধকতা নেই।

গ্রেনাডা
ছবি:Flag of Grenada.svg - উইকিপিডিয়া

গ্রেনাডা–এর নাগরিকত্ব কর্মসূচির একটি বিশেষ সুবিধা হলো—এই দেশের নাগরিকেরা যুক্তরাষ্ট্রের ই-২ ইনভেস্টর ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন, যা অনেক ক্যারিবীয় দেশের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এখানে নাগরিকত্ব পেতে ন্যূনতম ২ লাখ ৩৫ হাজার ডলার অনুদান বা অনুমোদিত আবাসন খাতে বিনিয়োগ করতে হয়।

ডোমিনিকা
ছবি:Flag of Dominica.svg - উইকিপিডিয়া

ডোমিনিকা–এর কর্মসূচি তুলনামূলক সাশ্রয়ী হিসেবে পরিচিত। ন্যূনতম ২ লাখ ডলার অনুদান বা আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। এখানে বসবাসের বাধ্যবাধকতা নেই, যদিও ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কিছু প্রশ্ন উঠেছে।

অ্যান্টিগা ও বারবুডা
অ্যান্টিগা ও বার্বুডা - উইকিপিডিয়া

অ্যান্টিগা ও বারবুডা–এ ২ লাখ ৩০ হাজার ডলার অনুদান বা তিন লাখ ডলার আবাসন বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্বের আবেদন করা যায়। তবে প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত পাঁচ দিন দেশটিতে অবস্থান করার শর্ত রয়েছে।

সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস
ছবি:Flag of Saint Kitts and Nevis.svg - উইকিপিডিয়া

ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশ সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস ১৯৮৪ সালে বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব কর্মসূচি চালু করে, যা আধুনিক সিবিআই মডেলের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার সরকারি তহবিলে অনুদান বা ৩ লাখ ২৫ হাজার ডলার আবাসন বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। আবাসনে বিনিয়োগ করলে অন্তত সাত বছর মালিকানা ধরে রাখতে হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং চলাচলের স্বাধীনতা—এই তিনটি বিষয়ই দ্বিতীয় নাগরিকত্বের চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগভিত্তিক নাগরিকত্ব কর্মসূচি আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।