সারাদেশ

বিজেপির উত্থানে ভারতে কমছে মুসলিম জনপ্রতিনিধিত্ব

হিন্দুত্ব রাজনীতির বিস্তার, ভোটের মেরুকরণ ও দলীয় কৌশলের প্রভাবে বিভিন্ন রাজ্যে দ্রুত কমে যাচ্ছে মুসলিম বিধায়ক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতি।
নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট: ০৪:০৭, ১১ মে ২০২৬
photo

কামাল পাশা  

ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক

ভারতে বিজেপির রাজনৈতিক বিস্তার যত বেড়েছে, ততই কমেছে মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যা—এমন প্রবণতা এখন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসার পর ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক মেরুকরণ আরও দৃশ্যমান হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এর এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৩৯। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ২৫৫ থেকে ২৮২–এর মধ্যে। সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে। উত্তর প্রদেশে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা ৬৩ থেকে নেমে ৩১–এ দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ৫৯ থেকে ৩৭ এবং বিহারে ১৯ থেকে ১১–এ কমেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিমদের জনসংখ্যার অনুপাতে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এখন অনেক কম। অথচ ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশই মুসলিম।

বিজেপির আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে পরিচিত “হিন্দুত্ব” রাজনীতি এই পরিবর্তনের বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন নির্বাচনে বিজেপি খুব কম সংখ্যক মুসলিম প্রার্থী দেয়, অনেক সময় একেবারেই দেয় না। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি মুসলিম প্রার্থী না দিয়েই সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটকে একত্রিত করার কৌশল নিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াইয়ের মতে, বিজেপির উত্থানের ফলে মুসলিম ভোটাররা ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর দিকে আরও বেশি ঝুঁকছেন। কিন্তু এর উল্টো প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু ভোটের বড় অংশ বিজেপির পক্ষে একত্রিত হচ্ছে। তিনি একে “উল্টো মেরুকরণ” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

তবে শুধু বিজেপিই নয়, বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম ভোটের ওপর নির্ভর করলেও তারা মুসলিম প্রার্থী মনোনয়নে সতর্ক অবস্থান নেয়। কারণ, অতিরিক্ত মুসলিম প্রতিনিধিত্ব দেখালে হিন্দু ভোট হারানোর আশঙ্কা থাকে বলে মনে করেন রাজনৈতিক কৌশলবিদরা।

জার্নাল অব ডেমোক্রেসিতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের মুসলিমরা এখন এক ধরনের রাজনৈতিক সংকটে আছে। একদিকে বিজেপির সরাসরি বর্জন, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর কৌশলগত দূরত্ব—দুই মিলিয়ে মুসলিম নেতৃত্ব ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

উত্তর প্রদেশের পরিস্থিতি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একসময় রাজ্যটির জোট রাজনীতিতে মুসলিম নেতাদের বড় ভূমিকা ছিল। কিন্তু বর্তমানে হিন্দুত্ব রাজনীতির শক্তিশালী উত্থান এবং বিজেপির সাংগঠনিক আধিপত্য মুসলিম নেতৃত্বকে অনেকটাই প্রান্তিক করে দিয়েছে।

ভারতের গণতন্ত্রে মুসলিমরা এখনো একটি বড় ভোটভিত্তি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—তারা কি ধীরে ধীরে শুধু ভোটার হিসেবেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছেন, নাকি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বেও তাদের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে?