সারাদেশ

সংসদে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব: স্মরণ করা হলো বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট: ০৩:৪৫, ১২ মার্চ ২০২৬
photo

তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের দুইবারের বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া–এর মৃত্যুতে জাতীয় সংসদে শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদে এ শোকপ্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

 

শোকপ্রস্তাবে এই নেত্রীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার ‘আপসহীন’ ভূমিকা, রাষ্ট্র পরিচালনায় সাফল্য এবং বিগত সরকারের আমলে কারাবরণ ও নির্যাতনের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। প্রস্তাবটি সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

 

শোকপ্রস্তাবে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর Evercare Hospital Dhaka–এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন খালেদা জিয়া। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

 

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলার মুদিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা বেগম তৈয়বা মজুমদার।

 

১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

 

শোকপ্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দেশ স্বৈরাচারের কবলে পড়লে জনগণ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের অনুরোধে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন। রাজনীতিতে তার আপসহীন ভূমিকার কারণেই স্বৈরাচারের পতন ত্বরান্বিত হয় এবং গণতন্ত্রকামী জনগণ তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে অভিহিত করে।

 

৪৩ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি এক বিরল রেকর্ডের অধিকারী। সংসদে জানানো হয়, তিনি যতগুলো সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তার সবকটিতেই জয়ী হয়েছেন—যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনন্য।

 

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম, মুসলিম বিশ্বে দ্বিতীয় এবং দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থ নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বেই দেশে পুনরায় সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা চালু হয়।

 

পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তার শাসনামলে অর্থনৈতিক সংস্কার, মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ এবং দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আনতে ‘ডাল-ভাত’ কর্মসূচি চালুর কথাও শোকপ্রস্তাবে স্মরণ করা হয়। নারী শিক্ষায় মেয়েদের দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালুর বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।

 

শোকপ্রস্তাবে আরও বলা হয়, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি মোট পাঁচবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয় এবং কারাবন্দি অবস্থায় দীর্ঘদিন সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়।

 

প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর তাকে সব মামলা থেকে মুক্ত করা হয়। ওই বছরের ৭ আগস্ট এক ভিডিও বার্তায় তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, “ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।”

 

পরিশেষে, দেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে খালেদা জিয়ার ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়ে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করে জাতীয় সংসদে শোকপ্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়।