প্রতিবেদন প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, সময়ঃ ০৯:০৮
ইসলামিক টিভি ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, প্রায় ৯১ লাখ মানুষ এবারের ভোটাধিকার হারিয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল সংখ্যক মানুষ মাত্র কয়েক মাস আগে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছিলেন। কমিশনের এই পদক্ষেপকে 'ভোট ডাকাতি' ও 'গণতন্ত্র হরণ' বলে আখ্যা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লাখ ১০ হাজার ৬ জন। ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর কয়েক দফায় নাম বাদ দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৫৮ লাখ ২১ হাজার নাম কাটা যায়। পরবর্তীতে আরও ৫ লাখ ৪৬ হাজার এবং শেষ ধাপে 'যুক্তিপূর্ণ অসংগতি'র অজুহাতে আরও ৬১ লাখ নাম তালিকায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আইনি লড়াই শেষে দেখা যায়, মোট ৯১ লাখ মানুষ ভোটার তালিকা থেকে ছিটকে পড়েছেন।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মৃত ব্যক্তি, ঠিকানা পরিবর্তন এবং ভুয়া ভোটার শনাক্ত করতেই এই পদক্ষেপ। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নাম ও পদবির বানানের সামান্য ভুলের কারণে অধিকাংশ নাম বাদ পড়েছে। যেমন: কারো পদবি 'বন্দ্যোপাধ্যায়' কিন্তু তালিকায় 'ব্যানার্জি' থাকায় তা বাতিল করা হয়েছে। আবার 'মিজানুর' বা 'রহমান' নামের বানানে একটি অক্ষরের হেরফের হওয়ায় অনেককে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক নারী বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন করায় তাদের নামও বাদ দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাদ পড়া ভোটারদের একটি বিশাল অংশ সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের। তথ্য বলছে, যাচাই-বাছাই করা তালিকায় থাকা ৬৫ শতাংশ মানুষই মুসলিম। মুর্শিদাবাদ জেলায় সর্বোচ্চ ভোটারের নাম কাটা গেছে, যেখানে জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশই মুসলিম। এছাড়া মালদহ, উত্তর দিনাজপুর ও কলকাতার মেটিয়াবুরুজের মতো এলাকাগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই এলাকাগুলো তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
কেবল মুসলিম নয়, ওপার বাংলা থেকে আসা হিন্দু তথা মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটারদের ওপরও বড় প্রভাব পড়েছে। নাগরিকত্বের আশায় থাকা সত্ত্বেও নদীয়া ও উত্তর ২৪ পরগনার মতুয়া অধ্যুষিত আসনগুলোতে অসংখ্য মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এতে ক্ষুব্ধ মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিজেপির ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, বিজেপিকে সুবিধা করে দিতেই নির্বাচন কমিশন এই ধরণের তড়িঘড়ি পদক্ষেপ নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, "বিজেপির নির্দেশে বেছে বেছে আমাদের ভোট ব্যাংক লক্ষ্য করে এই কোপ দেওয়া হয়েছে।" ৬১ লাখ মানুষের মধ্যে ২৭ লাখের বেশি মানুষ আইনি জটিলতায় পড়ে এবার ভোট দিতে পারছেন না। বিরোধীদের দাবি, এই বিপুল সংখ্যক নিরপরাধ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের দায় কমিশনকেই নিতে হবে।
এই বিশাল ভোটার বিয়োজন আগামী নির্বাচনে কী প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।