জ্বালানি সংকটে জনজীবনে অস্থিরতার আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রতিবেদন প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, সময়ঃ ০২:৪০

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে। সুদূর মরুভূমির রণক্ষেত্রের আগুনের আঁচ এখন অনুভূত হচ্ছে দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ লাইনে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশে এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকট ঘনীভূত হচ্ছে, যা পুরো অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে।

 

ইরানের সাম্প্রতিক হামলার পর সৌদি আরবের একটি বড় তেল শোধনাগার অচল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতার তাদের উৎপাদন ও সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের প্রধান রুট 'হরমুজ প্রণালি' কার্যত অচল হয়ে পড়া। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। এই পথ বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট ও দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।

 

বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার সিংহভাগ আমদানির ওপর নির্ভর করে। অপরিশোধিত তেল সৌদি আরব ও আমিরাত থেকে আসলেও, পরিশোধিত তেলের জন্য চীন, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে চীন তাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ডিজেল ও পেট্রোল রপ্তানি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

দেশে বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৪,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২,৬৫৯ মিলিয়ন ঘনফুট। এই বিশাল ঘাটতি সামাল দিতে পেট্রোবাংলা ইতিমধ্যে গ্যাস রেশনিং শুরু করেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দৈনিক ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমানো হবে। এর ফলে শিল্প-কারখানা, সার উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাসের টান পড়বে। ইতিমধ্যে দেশের ৬টি বড় সার কারখানার মধ্যে ৫টিই উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।

 

গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আগামী সপ্তাহ থেকে এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং শুরু করার পরিকল্পনা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিপিডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমায় এখন কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সাধারণ নাগরিকদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

 

মার্চ মাসে ৯টি এলএনজি কার্গো আসার কথা থাকলেও কাতার থেকে আসা পরবর্তী চালানগুলো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এছাড়া খোলা বাজারে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট ১২ ডলার থেকে বেড়ে ২৫ ডলারে ঠেকেছে। অন্যদিকে, দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে মাত্র ৯ দিনের এবং অকটেনের ১৫ দিনের। তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে যাতে কোনোভাবেই পাচার না হয়।

 

জ্বালানি সাশ্রয়ে ব্যক্তিগতভাবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে অর্ধেক বাতি বন্ধ রেখে এবং এসির তাপমাত্রা ২৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নির্ধারণ করে কাজ করছেন। তিনি দেশবাসীকেও এই পথ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন।

 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম এবং অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, এই সংকট আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের ঝুঁকিকে স্পষ্টভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং বিকল্প উৎস খোঁজার কোনো বিকল্প নেই।

 

এদিকে সংকটের আশঙ্কায় রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেক চালকই ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে গাড়ির ট্যাংক পূর্ণ করে তেল সংগ্রহ করছেন, যার ফলে অনেক পাম্পে সাময়িকভাবে তেল বিক্রি বন্ধ রাখতে দেখা গেছে।