প্রতিবেদন প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬, সময়ঃ ১২:০৩
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত সংঘাতে ঝলমলে প্রমোদনগরী দুবাই এখন উৎকণ্ঠার শহর। ইরানে ইসরায়েল ও এর ঘনিষ্ঠ মিত্র আমেরিকার যৌথ হামলার জেরে তেহরান পাল্টা আঘাত হানছে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে। সেই ধারাবাহিকতায় দুবাইয়ে বিস্ফোরণ, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অবকাঠামো, বন্ধ হয়েছে বিমান চলাচল। ফলে সেখানকার ধনী বাসিন্দা, প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও বিদেশি পর্যটকেরা পড়েছেন চরম বিপাকে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। তবুও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় তেহরানে নিজেদের দূতাবাস বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ বা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় দুবাই ছাড়ার একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ। এতে ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে স্বাভাবিক সময়ের প্রায় তিন গুণ। মাসকাটভিত্তিক উড়োজাহাজ ভাড়া-ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ছোট আকারের একটি উড়োজাহাজে করে ইস্তামবুল যেতে খরচ পড়ছে প্রায় ৮৫ হাজার ইউরো। আবার রাসিয়াগামী ভাড়ায় চালিত উড়োজাহাজে প্রতি আসনের ভাড়া ২০ হাজার ইউরো পর্যন্ত উঠেছে।
অস্ট্রিয়াভিত্তিক চার্টার কোম্পানি আলবা জেট জানিয়েছে, ইউরোপমুখী ফ্লাইটের জন্য তারা প্রায় ৯০ হাজার ইউরো পর্যন্ত ভাড়া চাইছে। বিমা জটিলতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান উড়োজাহাজ চালাতে অনীহা দেখাচ্ছে।
দুবাই থেকে বহু মানুষ গাড়ি চালিয়ে পার্শ্ববর্তী ওমান-এর রাজধানী মাসকট-এ ছুটছেন। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার এ পথ পাড়ি দিয়ে অনেকে সেখান থেকে ইউরোপ বা এশিয়ার গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে মাসকাট থেকেও অধিকাংশ ফ্লাইটের টিকিট সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত বিক্রি হয়ে গেছে।
আরেকটি বিকল্প হয়ে উঠেছে রিয়াদ। ১০ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে অনেকে সৌদি আরবে পৌঁছে সেখান থেকে ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ নিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিমাফর জানিয়েছে, বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ক্রীড়াবহুল বড় গাড়ির বহর ভাড়া করে গ্রাহকদের রিয়াদে পৌঁছে দিচ্ছে।
দুবাইয়ে ছুটিতে আসা বহু পর্যটক এখন কার্যত আটকা। রুশ পর্যটক আলেকজান্দ্রা ভাভিলোভা জানান, বহু চেষ্টার পর তিনি মাসকাট থেকে কলম্বগামী একটি ফ্লাইটের টিকিট পেয়েছেন।
এদিকে ইতালিতে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো সরকারি উড়োজাহাজে করে দুবাই থেকে Rome ফিরেছেন। যখন শত শত ইতালীয় নাগরিক দুবাইয়ে আটকা, তখন মন্ত্রীর এভাবে দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনা চলছে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বন্দরগুলো প্রায় অচল হয়ে পড়ায় অন্তত ছয়টি বড় প্রমোদতরি মাঝসমুদ্রে নোঙর করে আছে। জার্মান সংবাদমাধ্যম বিল্ড জানিয়েছে, একটি জাহাজের যাত্রীরা আবুধাবির জায়েদ বন্দরে বিস্ফোরণের দৃশ্য ধারণ করেছেন। একইভাবে আরেকটি প্রমোদতরির যাত্রীরাও জানিয়েছেন, তাঁদের কেবিনে অবস্থান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবুধাবী-এর জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফ্লাইটরাডার 24 জানিয়েছে, সীমিত আকারে কিছু ফ্লাইট ছেড়ে গেছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
দুবাইভিত্তিক আইনজীবী ইরিনা হিভার সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, বর্তমানে দুবাইয়ে থাকা মানুষ তিন দলে বিভক্ত—
এক দল দ্রুত সীমান্তের দিকে ছুটছে;
দ্বিতীয় দল পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে বলে বিশ্বাস করছে;
তৃতীয় দল সরকারি নির্দেশনা মেনে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
ঝলমলে আকাশরেখা আর বিলাসী জীবনযাপনের শহর দুবাই আজ আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও ব্যয়বহুল পালানোর গল্পে মুখর। ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের আকাশছোঁয়া ভাড়া যেন এ সংকটের সবচেয়ে প্রতীকী চিত্র—যেখানে নিরাপত্তাও এখন কেবল সামর্থ্যবানদের নাগালে।