চাগোস দ্বীপপুঞ্জ হস্তান্তরে ব্রিটিশ পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা ট্রাম্পের, স্টারমারকে সতর্কবার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রতিবেদন প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, সময়ঃ ০৪:১০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের কাছে হস্তান্তর এবং সেখানে অবস্থিত কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি ইজারা নেওয়ার ব্রিটিশ পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার-কে সরাসরি সতর্ক করে তিনি বলেছেন, ‘দিয়েগো গার্সিয়া হাতছাড়া করবেন না।’

বুধবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাজ্যের এসব দ্বীপ হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত একটি বড় কৌশলগত ভুল। তাঁর মতে, চাগোস দ্বীপপুঞ্জ ছেড়ে দেওয়া হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে যুক্তরাজ্যের জন্য একটি কলঙ্কজনক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে ভিন্নমত

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর মাত্র এক দিন আগেই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের হাতে তুলে দেওয়ার যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছিল। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রকাশ্য বিরোধিতায় ওয়াশিংটনের ভেতরে নীতিগত বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের অবস্থান

ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাবে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, চাগোস দ্বীপপুঞ্জ–সংক্রান্ত চুক্তিটি যুক্তরাজ্য ও তার মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এর আগেই বলেছিলেন, সামরিক ঘাঁটির কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত রাখতেই এই চুক্তি অপরিহার্য।

দিয়েগো গার্সিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব

ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক অভিযানের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করলেও আগামী ৯৯ বছরের জন্য দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপটি ইজারা নেবে।

এই বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘লিজ বা ইজারা কোনো দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। ১০০ বছরের লিজে সই করে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার গুরুতর ভুল করছেন।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরানের সঙ্গে পরমাণু ইস্যুতে সমঝোতা ব্যর্থ হলে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় দিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটির প্রয়োজন হতে পারে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৮১৪ সাল থেকে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের লক্ষ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়। মরিশাস দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, স্বাধীনতার বিনিময়ে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ কেড়ে নিয়ে যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে।

যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্পের মন্তব্য যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল একে স্টারমার সরকারের জন্য ‘চরম অবমাননাকর’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে, রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ ট্রাম্পের অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে চুক্তিটি বাতিলের দাবি তুলেছেন।

 

বিশ্লেষকদের মতে, চাগোস দ্বীপপুঞ্জ ও দিয়েগো গার্সিয়াকে ঘিরে এই বিতর্ক শুধু যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই নয়, বরং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ব্রিটিশ সরকারের এই সিদ্ধান্ত এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।