যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি পুনর্বিবেচনার দাবি ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রতিবেদন প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, সময়ঃ ০১:০৯

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির শর্তগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কঠোর এবং এতে দেশের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, এই চুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে সীমিত করে দিতে পারে। তাই নতুন সরকারের কাছে চুক্তিটি পুনরায় পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তির প্রভাব’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব মতামত তুলে ধরা হয়। সভাটির আয়োজন করে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রি (বিসিআই)।

চুক্তিতে সুযোগ থাকলেও ঝুঁকিও রয়েছে

সভায় স্বাগত বক্তব্যে বিসিআইয়ের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করলেও এতে কিছু গুরুতর ঝুঁকি রয়েছে। তিনি বলেন, “চুক্তির আওতায় কোনো বাংলাদেশি কোম্পানি যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য কম দামে রপ্তানি করে, তবে সেটিকে অন্যায্য প্রতিযোগিতা হিসেবে বিবেচনা করে মার্কিন কর্তৃপক্ষ ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।”

গোপনে চুক্তি স্বাক্ষরের অভিযোগ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, একটি অনির্বাচিত ও অরাজনৈতিক সরকার অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে এবং তাড়াহুড়োর মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তাঁর ভাষায়, “এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া উচিত ছিল। এখানে দেশের স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।”

অন্য দেশও একই সুবিধা চাইতে পারে

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, চুক্তিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশও একই ধরনের সুবিধা দাবি করতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

আইনি কাঠামোর পরামর্শ

গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক পরামর্শ দেন, চুক্তি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্বনামধন্য আইনি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা উচিত।

অন্যদিকে, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চুক্তির কারণে যদি কোনো আইন সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তা দ্রুত সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সম্পন্ন করা উচিত।

তুলনামূলকভাবে কঠোর শর্ত

অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তিটি অত্যন্ত কঠোর শর্তভিত্তিক। অথচ মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি নমনীয়।”

তিনি চুক্তি নিয়ে পাঁচটি সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—সংসদে চুক্তি পর্যালোচনা সাপেক্ষে অনুমোদন, আইনি কাঠামোর মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা।

প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়া অনিশ্চিত

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, “এই চুক্তির মাধ্যমে যে সুবিধা পাওয়ার আশা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা পাওয়া কঠিন হবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অংশীজনদের মতামত নিয়ে চুক্তিটি পুনরায় পর্যালোচনা করা জরুরি।”