প্রতিবেদন প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫, সময়ঃ ০৭:৪৮
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন। শুক্রবার মহাসচিবের মুখপাত্রের দপ্তরে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে স্টিফেন ডুজারিক একথা জানান।
স্টিফেন ডুজারিক বলেন, তরুণ নেতা শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনায় জাতিসংঘ মহাসচিব নিন্দা জানিয়েছেন এবং তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। ডুজারিক আরও বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী দ্রুত, নিরপেক্ষ, পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
অ্যান্তোনিও গুতেরেস সবাইকে শান্ত থাকারও আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের আগে দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকা, উত্তেজনা কমানো এবং সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।
কমনওয়েলথের শোক ও উদ্বেগ : শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে কমনওয়েলথ। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সহিংসতার পর বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। শনিবার এক বিবৃতিতে এ শোক প্রকাশ করেন সংস্থার মহাসচিব শির্লে বোচওয়ে। বিবৃতিতে মহাসচিব বলেন, শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের শোকের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছি এবং তার পরিবার ও প্রিয়জনদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। ঢাকা ও দেশের অন্যান্য স্থানে সাম্প্রতিক সহিংসতার পর বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি আরও বলেন, আমি আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং গণমাধ্যমকর্মীসহ সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বক্তব্যকে স্বাগত জানাই, যেখানে সহিংসতায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এবং সবাইকে সংযম, দায়িত্বশীলতা ও ঘৃণা বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের : অন্তর্বর্তী সরকারকে শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের দ্রুত, পুঙ্খানুপুঙ্খ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে এ আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। পোস্টে দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং ছায়ানটের অফিসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা এবং নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরকে হয়রানির ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তেরও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
সেই সঙ্গে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দু পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এছাড়াও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অন্তর্বর্তী সরকারকে মৃত্যুদণ্ড ছাড়াই সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের জন্য দোষীদের ন্যায়বিচারের আওতায় আনার জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ প্রকাশ : দেশের শীর্ষ দুটি সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। শুক্রবার লন্ডন থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, এসব হামলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর ও ভয়াবহ আঘাত। বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। এই সহিংস ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে সংঘটিত হচ্ছে, যখন দেশটি দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও বলেছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা এবং চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা বাংলাদেশের নাগরিক পরিসরকে ক্রমশ সংকুচিত করছে, যা নতুন করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, তরুণ নেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ছিল একটি জঘন্য অপরাধ। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে যেভাবে দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে, তা রোধে কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করতে প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি। কিছু রাজনৈতিক পক্ষের সহিংসতায় উসকানি-বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামাজিককর্মী এমনকি শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদেরও বাড়তি ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
আর্টিকেল নাইনটিনের নিন্দা : দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার নিন্দা জানিয়েছে আর্টিকেল নাইনটিন। শুক্রবার আর্টিকেল নাইনটিনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই নিন্দা জানানো হয়। সম্পাদক পরিষদের সভাপতি, নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরকে হেনস্তা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের ওপর হামলার নিন্দাও জানিয়েছে সংগঠনটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দৈনিক প্রথম আলো এবং ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার সাম্প্রতিক সময়গুলোতে রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক চরমপন্থি গোষ্ঠীর হুমকির মুখে রয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে এসব হামলার ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে সাংবাদিক, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি শত্রুতা, হয়রানি ও সহিংসতা গভীর ও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে। ডেইলি স্টার কার্যালয়ের সামনে নিউ এজ সম্পাদক এবং সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীরকে হেনস্তা প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে এমন আক্রমণাত্মক ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটে হামলা নিয়ে আর্টিকেল নাইনটিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশজুড়ে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, শিল্পী এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধির নজির এটি। এই ক্রমবর্ধমান হামলার ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে যে সাংবাদিকতা, সাংস্কৃতিক প্রকাশ এবং নাগরিক আলোচনায় যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য পরিবেশ ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ ও অরক্ষিত হয়ে উঠছে।
আর্টিকেল নাইনটিন মনে করে, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশে সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে হুমকি, নজরদারি, হয়রানি, হামলার মতো ঘটনাগুলো তদন্তের বাইরে থেকে যায় এবং অপরাধীরা সাজা পায় না। রাষ্ট্র অপরাধীদের বিচার করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে অপরাধীদের সাহস বেড়েছে এবং সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বরের ওপর হামলার ঘটনা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ সরকারের ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসসহ (আইসিসিপিআর) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিগুলো মেনে চলার আইনি বাধ্যবাধকতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আর্টিকেল নাইনটিন বলেছে, এই চুক্তি অনুযায়ী, রাষ্ট্রকে মতপ্রকাশের অধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে।